সুনামগঞ্জ , রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬ , ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
জুলাই সনদ নিয়ে বিরোধী দল জনগণকে বিভ্রান্ত করছে : মির্জা ফখরুল হেফাজতের উদ্যোগে এক হচ্ছে ৭ ইসলামি দল শান্তিগঞ্জে রুস্তম আলী হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হাওর-নদী হারাচ্ছে পানি ধারণ ক্ষমতা, বাড়ছে অকাল বন্যার শঙ্কা জেলা শিল্পকলা একাডেমির গুণীজন সম্মাননা প্রদান আজ জুলাই শহীদ দিবস পালন সরকার জনগণের সাথে বেইমানি করেছে বর্ণাঢ্য রথযাত্রায় ভক্তদের ঢল ছাতকের জলাশয়ে মিলছে রাক্ষুসে সাকার মাছ! জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার দন্ডপ্রাপ্ত সাবেক মেজর ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজে অন্তহীন বাধা শান্তিগঞ্জে দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১, গ্রেফতার ৩ যাদুকাটা, রক্তি ও পাটলাই নদীতে অতিরিক্ত টোল আদায়ের প্রতিবাদে মানববন্ধন হাওরের আতঙ্ক ‘আফাল’ রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট একজনের মৃত্যুদন্ড, তিনজনের যাবজ্জীবন শিক্ষামন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ দাবদাহে যুক্তরাজ্যে ২৭০০ জনের প্রাণহানি খাসিয়ামারা নদী গিলছে ভিটেমাটি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ

হাসন রাজার তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী ও হাসনজান

  • আপলোড সময় : ১৮-০৭-২০২৬ ০৫:৩৭:৩৫ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১৮-০৭-২০২৬ ০৫:৩৮:৩১ অপরাহ্ন
হাসন রাজার তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী ও হাসনজান
সামারীন দেওয়ান::
হাসন রাজার প্রথম স্ত্রী নাম ছিল বুরজান বানু। মুহাম্মদজান ধীর নামে এক ব্যক্তি তখনকার সময়ে মক্কায় হজ্জ আয়োজন ব্যবসায় সুদূর পাকিস্তানের শিয়ালকুট থেকে এসে সুনামগঞ্জ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। এই সূত্রে সুনামগঞ্জ শহরের আরপিন নগরস্থিত তালুকদার বাড়ির সাথে তাঁর বিয়ের সম্বন্ধ করেন। সেটি বৃটিশ ক¤পানী যুগের কথা। পরবর্তীকালে ১৮৭২/৭৩ সালের দিকে যখন হাসন রাজার বয়স ছিল মাত্র ১৮ কি ১৯। ঐ মুহাম্মদজান ধীরের একমাত্র কন্যা বুরজান বানুকে স্ত্রীর মর্যাদা দেয়ার মাধ্যমেই হাসন রাজার প্রথম পুত্র দেওয়ান গনিউর রাজার জন্ম ১৮৭৪ সালে। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী আজিজা বানুর সাথে বিবাহ বন্ধন ঘটে ১৮৮০ এর দশকে। উপরোক্ত ঐ দু’জন স্ত্রীর ক্ষণে ক্ষণে অসুস্থতার কারণে হাসন রাজার মা হুরমতজান বানুর জোড়াজুড়িতে ১৮০০ সালের আশির দশকে তৃতীয় বিবাহে আবদ্ধ হন ভাটিপাড়ার চৌধুরী বাড়ির সুন্দরী কন্যে ফখরুন্নেছা চৌধুরীরানীর সাথে। তখনকার সময় পরিবারে বংশধর টিকিয়ে রাখার পক্ষে আল্লাহর নবী মোহাম্মদ (স:)-কে অনুসরণ করেই একাধিক বিবাহের প্রচলন ছিল। এছাড়া ভাটিপাড়ার জমিদার বাড়ি হাসন রাজার মায়ের মৃত স্বামী আমির বক্স চৌধুরীর বড়ভাই খোদাবক্স এর শ্বশুর বাড়ি ছিল। তাই পূর্ব-সম্পর্ক সূত্র ধরেই তাঁর তৃতীয় পুত্রবধূ হিসেবে ভাটিপাড়া থেকে নবাগতা ফখরুন্নেছাকে নিয়ে আসলেন সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রীর বাড়িতে। মায়ের ভাবনা ছিল কালিয়াজুরির বল্লীতে নাইওরিতে আসা-যাওয়ার সময় পথিমধ্যে ভাটিপাড়ায় পুত্রবধূর বাপের বাড়িতে বিশ্রামের জন্য ক্ষণে ক্ষণে নৌকাটি থামানো যাবে। মায়ের ইচ্ছা পূরণে হাসন রাজা পিছপা হলেন না। বরঞ্চ উৎসাহের সাথে সেই প্রস্তাবে রাজি হলেন। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ সাহেবের বরাত দিয়ে জানা যায় যে, সুনামগঞ্জের অন্তর্ভুক্ত দিরাই থানার ভাটিপাড়া নিবাসী জমিদার পরিবারের মোহাম্মদ খুরশেদ চৌধুরীর কন্যা ফখরুন্নেছা বানু চৌধুরীকে বিবাহ করেন ১২৯৫ বাংলা সনে। এই স্ত্রী লক্ষণশ্রীতে এসে ঠিক পারুয়ার বিবির মতো গান-বাজনার পরিবেশে নিজেকে বেশিদিন খাপ খাওয়াতে না পেরে একান্তেই তালাক চাইলেন। ফখরুন্নেছা লক্ষণশ্রীর বাড়িতে পা দেয়ার সাথে সাথে লক্ষ্য করলেন স্বামীর বাড়িতে রাজা সাহেবের কাছে স্ত্রীগণের প্রাধান্য এত বেশী নয় যতটুকু তাঁর দাসিবান্দির দৌরাত্ম্য রয়েছে। নববধূ ফখরুন্নেছা চৌধুরীর মধ্যে এই চিন্তা-ভাবনার তাড়না ও দখলটাই ছিল প্রধানত বেশী। বাড়ি ভর্তি এতসমস্ত বান্দী-গোলাম স্বচক্ষে দেখে তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠেলেন। নিজের চোখে তিনি বাস্তবিক পরিবেশ অবস্থা দৃষ্টে তিনি হতভম্ব হয়ে উঠলেন। হাসন রাজার বাড়িটি যদিও সাদামাটা মাটি, বাঁশ ও ছনের তৈরি ঘর, তথাপি পাঁচ একর নিয়ে প্রশস্ত বাড়িতে হৈ-হুল্লোর আর গান-বাজনার কোলাহলে প্রকম্পিত হয়ে উঠতো। কথিত আছে যে, দিরাই উপজেলাস্থিত তখনকার সময়ের ভাটিপাড়ার বিবি ফখরুন্নেছা চৌধুরানী এতটা মনটি এতখানি প্রসারিত ছিলো না অন্য বউগণের মতো। হাসন রাজার বাড়িতে ভাটিপাড়ার বিবি অত্র এলাকার নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এত লোকজন সঙ্গে করে সুনামগঞ্জ শহরে পাড়ি জমানোর পরও তাঁর মন ভালো না। এদের বংশধররা এখনো শহরের তেঘরিয়া ও আরপিন নগর নিবাসী হয়ে উঠেছেন। নতুন বিবির সাথে এই সঙ্গী-সাথীদের ভিড়ে কোলাহলমুখর হয়ে ওঠে রাজবাড়ি। ফখরুন্নেছা তাঁর বাপের বাড়ির এত সব লোকের সঙ্গ-নৈকট্য পেয়েও যেন খুশি হয়ে উঠতে পারলেন না। এ যেন এক অপরিচিত অনাত্মীয়ের আবাসস্থলে এসে উঠা। কিছুতেই খাপ খাইয়ে উঠতে পারছিলেন না। দুরূহ হয়ে ওঠে এ বাড়িতে বাস উপযোগী পরিবেশে দীর্ঘদিন সময় কাটানো। তিনি মেনে নিতে পারলেন না যে এত সমস্ত মহিলাদেরকে নিয়ে সাহেবের এত গান-বাজনার স¤পর্কটা কি? সাহেব বসে আছেন দুই হাতওয়াল চেয়ারের উপর আর তাঁর চারপাশে ২০ থেকে ৩০ জন নারী-পুরুষ শিল্পী তাঁকে ঘিরে গান গাচ্ছে ও নাচনের মধ্যে একি অদ্ভুত সাধনা! এতোগুলো নারীদের মধ্যভাগে থেকে হাসনজান ও হাসন রাজায় এই কি সাধনার মাত্রা। কে এই হাসনজান। উল্লেখ্য এই নারীগণ হাসন রাজার হাসনজানকে ভালোভাবেই চিনতেন বৈকি। কিন্তু ফখরুন্নেছা কোন সময়ই এই খবরটির সন্ধান নেননি। নারীগণ যখন সমস্বরে বলে উঠতো- “হাসনজানের রূপটা দেখি ফালদি ফালদি উঠে, ছিড়াভাড়া হাসন রাজার বুকের মাঝে কোটে। নিশা লাগিলো রে বাঁকা দু নয়নে নিশা লাগিলো রে। হাসন রাজা পিয়া্িরর প্রেমে মজিল রে।” ফখরুন্নেছার মনের মাঝে উঁকিঝুঁকি দিতো এই পিয়ারিটির অবস্থানটি কোথায়? তাঁকে অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে। আশ্চর্য হয়ে ওঠলেন যে হাসন রাজা তাঁর সাথে এ কোন ধরনের মশকরা চালিয়ে যাচ্ছেন গত এক মাস অবধি! আর তাঁর সাথীরা কেউ কেউ মশকরা করে হাসাহাসির খেলা চালাচ্ছে আবার অন্যরা কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছে। ফখরুন্নেছা এই অবস্থায় পাগল হয়ে উঠবেন। এ পরিবেশে কেমন করে তিনি বেঁচে থাকবেন! যে সাধনার জগতে হাসনজানকে (¯্রষ্টা) খুঁজতে এরকম ৩০-৪০ জনের নারীদের সাথে ছিল হাসন রাজার এক অভাবনীয় প্ল্যাটনিক সম্পর্ক। তাঁর সাথে এরকম অদ্ভুত নিষ্কাম ও নির্লোভ এক ধরনের বিশুদ্ধ, আত্মিক সম্পর্ক, যেখানে কোনো কামনা-বাসনা বা শারীরিক আকর্ষণের স্থান মিলে না। একে বাংলায় নিষ্কাম ভালোবাসা বা স্বর্গীয় প্রেম বলা হয়ে থাকে। হাসন রাজা তাই ছিলেন এক অপূর্ব প্রেমে নিমজ্জিত সত্ত্বা। হাসন রাজার এমন এক আচরণ তাঁর নিজের মধ্যে জিইয়ে রেখে একদিকে তিনি যেমন মহিমান্বিত হয়ে উঠেছিলেন, আর অন্যদিকে ফখরুন্নেছা রাগ-অভিমান-কষ্ট বেঁধে রাখতে পারলেন না। বাঁধ ভেঙ্গে পড়ার মতো অবস্থায় তিনি হাসন রাজার সম্মুখে একদিন গিয়ে হাজির হয়ে জানালেন যে, তিনি কিছুতেই এই সংসার করতে পারবেন না। ফখরুন্নেছা সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিয়েই হাসন রাজা স্ত্রীকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত কবি ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দিলেন। ডেকে নিয়ে আসা হল স্থানীয় একজন কাজী সাহেবকে। বিবির ইচ্ছা অনুযায়ী হাসন রাজা তাঁকে তালাক প্রদান করলেন। ঐ দিনই সকালের দিকেই বাপের বাড়ি ফেরত যাওয়ার উদ্দেশ্যে দুইখানি ভাওয়ালি নৌকা (প্রশস্ত, আজকাল ছোট লঞ্চের মত আয়তন) দিয়ে তাঁর বাপের বাড়ি থেকে প্রাপ্ত সামগ্রী ও হাসন রাজার দেয়া যত সমস্ত বিয়ের সরঞ্জামাদি নৌকা বোঝাই করে ফখরুন্নেছা ভাটিপাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। হাসন রাজা চাইলেন তাঁর বাড়িতে এই বিবির কোন স্মৃতিচিহ্ন যেন না থাকে। আমি জানিনা এই তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর প্রসঙ্গ অনেক স্যোশাল মিডিয়া বা খ-িত আকারে ছোট ছোট লেখায় কেন নিয়ে আসা হচ্ছে। কোন একটা বিতর্ক জুড়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কিনা। উপরের ঘটনা থেকে এ-ই পরিলক্ষিত হয় যে হাসন রাজা কোন কালেই কারো উপর জোর জবরদস্তি করতে যেতেন না। তাঁর স্বভাবে এরকমটি ছিল না। হাসন রাজা সকল মানুষকে মর্যাদা দিতেন, ভালোবাসতেন। তাঁর মূল দর্শনটি ছিল অনেকটা রুমির মতোই। সর্বজনীন প্রেম, সমগ্র অস্তিত্বের ঐক্য এবং অহংবোধকে অতিক্রম করে পরম সত্তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার আকাক্সক্ষার ওপর ভিত্তি করেই মানবজীবনের উদ্দেশ্য খুঁজতেন। আত্ম-আবিষ্কারের এক আধ্যাত্মিক যাত্রায়, যেখানে অন্তরের পরিশুদ্ধি, মানুষকে ঈশ্বরের সঙ্গে মিলনে তাঁর জীবনের সার্থকতা খুঁজে পেতেন। ঠিক রুমির মতোই সর্বজনীন প্রেম (ইশক) মহাজাগতিক শক্তি ও প্রেমকে কেবল মানবিক অনুভূতি হিসেবে নয়, বরং এক পরম সত্যকে ধারণ করে সর্বোচ্চ পরমেশ্বরের প্রেমে বিলীন হয়ে যাওয়াই যেনো তাঁর প্রধানতম উদ্দেশ্য।
[সামারীন দেওয়ানলেখক গবেষক]

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স